মধ্যরাতে সচিবালয়ে আগুন, নানা প্রশ্ন

দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষিত দপ্তর বাংলাদেশ সচিবালয়। আর এই দপ্তরে মধ্যরাতে আগুন লাগার ঘটনা জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নের। গতকাল বুধবার দিবাগত রাত ১টা ৫২ মিনিটে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুন লাগে। ৬ ঘণ্টা পর আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস।

এদিকে গতকাল জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবি করে আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন আমলারা। প্রশাসনে এমন চলমান অস্থিরতার মধ্যেই এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলো।

এটি নাশকতা, না-কি স্বাভাবিক অগ্নিকাণ্ড  এ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ।  এ ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ।

তিনি তার ফেসবুকে স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের বিগত সময়ে হওয়া অর্থলোপাট, দুর্নীতি নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম। কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাটের প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল। আগুনে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এখনো জানা যায়নি। আমাদেরকে ব্যর্থ করার এই ষড়যন্ত্রে যে বা যারাই জড়িত থাকবে তাদের বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেয়া হবে না।’

অন্যদিকে ফ্যাসিস্টদের পক্ষে ‘সিমপ্যাথি গেইন’ ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে উল্লেখ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘এই ক্যাম্পেইন না থামাতে পারলে আপনি শেষ। আজকে আমলা আগামীকাল অন্য কেউ।’

তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ফ্যাসিজমের এনাবলারদের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের উদারতা দেখানোর পরিণাম এই কপালপোড়া জাতিকে অনন্তকাল ভুগাবে। হাসিনার (সাবেক প্রধানমন্ত্রী) ঘি খাওয়া ফ্যাসিস্ট এনাবেলররাই এখন মানবাধিকারের আলাপ দিয়ে ফ্যাসিস্টদের পক্ষে ‘সিমপ্যাথি গেইন’ ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে। এই ক্যাম্পেইন না থামাতে পারলে আপনি শেষ। আজকে আমলা আগামীকাল অন্য কেউ।

সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের পর এমন মন্তব্য এলো তার কাছ থেকে।

আগুন পরিকল্পিতভাবে লাগানো হয়েছে বলে মনে করেন সচিবালয়ের কাছে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি মানবজমিনকে বলেন, ‘যে আগুনটা লেগেছে, সুনিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পারেন এটা সুপরিকল্পিত।’

সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। উষ্মা প্রকাশ করে তিনি মানবজমিনকে বলেন, ‘সচিবালয়ের ভেতরে একশ থেকে দেড়শ সিকিউরিটি গার্ড থাকে। আগুন লাগার পর কি একজনেরও চোখে পড়েনি। এটা কীভাবে সম্ভব।’

আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর সকাল ৯টার দিকে সচিবালয়ে উপস্থিত হন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সেখানে এক ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভেতরে আমরা দেখবো। পুরো সার্চ করে কোনোকিছু পাওয়া যায় কি-না দেখা হবে।’

নাশকতা কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তদন্ত হওয়ার পর বিষয়টি জানা যাবে।’ 

এদিকে সচিবালয়ের আগুনের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শুরু হয়েছে নানাবিধ আলোচনা। অনেক ব্যবহারকারী এই আগুনকে নাশকতা বলছেন, কেউ বা নিরাপত্তা নিয়েও তুলছেন প্রশ্ন। 

উল্লেখ্য, বুধবার দিবাগত রাত ১টা ৫২ মিনিটে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুন লাগে। পরে ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিটের চেষ্টায় বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনায় সচিবালয়ে আগুন নেভাতে গিয়ে রাস্তা পারাপারের সময় ট্রাকচাপায় মো. সোহানুর জামান নয়ন (২৮) নামে এক ফায়ার সার্ভিস সদস্য নিহত হয়েছেন। তেজগাঁও ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে কর্মরত ছিলেন তিনি।

======================================


 সচিবালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতে প্রথমেই পড়ে ৭ নম্বর ভবন। গতকাল বুধবার দিবাগত রাত ১টা ৫০ মিনিটে ভবনটিতে আগুন লাগে। ছয় ঘণ্টা পর আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস।

আজ সকাল সাড়ে ৯টায় ৭ নম্বর ভবনের চারপাশে দেখা যায়, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে জানালার ভাঙা গ্লাস। আগুনে ভবনের ছয় থেকে আটতলা পুড়েছে।

ভবনের চারদিকে ফায়ার সার্ভিসের ছিটানো পানি। কয়েকটি কবুতর মরে পড়ে আছে। ভবনের ভেতরে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।ফায়ার সার্ভিসের একাধিক সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, আগুন নেভাতে গিয়ে তাঁদের পদে পদে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে। সচিবালয়ের ফটক দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ভেতরে ঢোকাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।

কর্মকর্তারা বলেন, আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিসের দুটি টার্নটেবল লেডার (টিটিএল) ভেতরে ঢুকতে পেরেছে। যদি আরও বেশি টিটিএল ঢুকতে পারত, তাহলে আরও আগে আগুন নেভানো সম্ভব হতো।

সচিবালয়ে ঢোকার মোট ফটক পাঁচটি। তবে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার ফটক আছে মাত্র দুটি। এই দুই ফটক দিয়েও ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি ঢুকতে সমস্যা হয়েছে বলে জানান কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেন, সচিবালয়ের ৪ নম্বর ফটক দিয়ে ঢুকতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি ভেঙে গেছে।

আগুন নেভানোর কাজ শেষে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সচিবালয় থেকে বের করতেও বেশ সমস্যা হয়েছে বলে জানান কর্মকর্তারা। গাড়ি বের করতে গিয়ে দেয়ালের কয়েকটি জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এর আগে বিভিন্ন সময় সচিবালয়ে ঢোকার ফটক সম্প্রসারণ করার কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু কেউ কথা শোনেনি।

কর্মকর্তারা বলেন, আগুন ছড়িয়ে পড়ার একটি বড় কারণ হলো, মন্ত্রণালয়গুলো কাঠ দিয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করেছে। এটি যখন করা হয়, তখন নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু কাঠ দিয়েই সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি রুম ছিল বন্ধ। তালা ভেঙে, জানালা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে হয়েছে।

আগুন নেভানোর কাজে জড়িত ফায়ার সার্ভিসের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, অভিযান পরিচালনা করতে তাঁদের বেশ সমস্যা হয়েছে। যে কারণে আগুন নেভাতে সময় লেগেছে।

সকাল ১০টা থেকে পুরো ভবনের চারপাশ ঘুরে দেখেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন মুরশিদসহ অন্যরা।এ সময় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকানোর সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। তখন গণপূর্তসচিব হামিদুর রহমান খান বলেন, ৬ নম্বর ভবনের সামনের চলন্ত করিডর ভেঙে দেওয়া হবে।

সরেজমিন দেখা যায়, ৭ নম্বর ভবনে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। আগুনে মূলত ছয়, সাত ও আটতলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘অফিসের নথিপত্র, কম্পিউটার, আসবাব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বলে তিনি শুনেছেন। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে একটি কমিটি গঠন করা হবে।’

ভবনের সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ধারণা করছেন, বাজেটের এক্সেল শিটগুলো ফিরে পাওয়া কঠিন হবে। দপ্তরে তাঁর ব্যক্তিগত সার্টিফিকেট ছিল, তা আর ফিরে পাবেন না তিনি। প্রশাসন শাখার গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ধ্বংস হয়ে গেছে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

সচিবালয়ে কর্মরত এক কর্মচারী তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোনে বলছিলেন, ‘স্যার, সব শেষ হয়ে গেল।’

source

mzamin ,prothomalo

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

নওফেলের ইসকন কানেকশন

দিল্লির আশীর্বাদ পেতে যা দিয়েছে হাসিনা সরকার

হাসিনার পরিকল্পনা ও নির্দেশে জুলাই গণহত্যা